রেডমিট বা লাল গোশত হতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কৌশল

রেডমিট হতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কৌশল

রেডমিট বা লাল গোশত হতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কৌশল

আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার প্রোটিনের অন্যতম আইটেম হলো রেডমিট তথা লাল গোশত। ভোজনরসিকদের কাছে এটি লোভনীয় আইটেম হিসেবে আদিম যুগ থেকে অদ্যাবধি চলে আসছে। মুসলিম কমিউনিটিতে ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এই রেডমিট বিশেষ করে গরুর গোশতের রয়েছে অপরিসীম কদর। কোরবানি মানেই ভোজন অনুষ্ঠানে লাল গোশত, পোলাও চর্বি-ঘি’যুক্ত মেনুর বাড়তি উপস্থিতি। পরিতৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পর এ চর্বি মানুষের রক্তে জমা হয়ে রক্তের কোলেস্টেরল মাত্রা বৃদ্ধি পায়। খাদ্যে বাড়তি কোলেস্টেরল স্বাস্ত্যসচেতন মানুষের জন্য একটি ভীতিকর উপাদান। হৃদ-বিপাকীয় রোগের জন্য লাল গোশত গ্রহণ একটি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ ফ্যাক্টর এসব রোগের মধ্যে অন্যতম হলো করোনারি হার্ট ডিজিজ (সিএইচডি) ও টাই-টু ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিক ম্যালাইটাস (ডিএম)। অতিরঞ্চিত এবং অতি উৎসাহের কারণে কেউ কেউ গরুর গোশতকে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছেন। তবে রেডমিট সম্পর্কে সতর্কবাণীর প্রায় পুরোটাই বয়স্কদের জন্য। যাদের বয়স ৩০-এর নিচে, রক্তে কোলেস্টেরল মাত্রা ঠিক আছে, মেদাধিক্য নেই, ওজনও স্বাভাবিক তাদের জন্য লাল গোশতের এ নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক নয়। প্রকৃতপক্ষে খাদ্যগুণ বিবেচনায় রেডমিট তথা গরুর গোশত হচ্ছে প্রাণিজ প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, থায়ামিন, রিবোফ্লভিন, সেলেনিয়াম ও ভিটামিন বি-১২ এর অন্যতম উৎস।

 

সম্প্রতি গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যায়, রেডমিট তথা লাল গোশত গ্রহণের প্রভাবে অন্ত্রে বসবাসকারী অণুজীবগুলো থেকে একধরনের বিশেষ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আর লাল গোশতের প্রভাবে অন্ত্রের বসাবাসকারী অণুজীবের প্রতিক্রিয়ায় প্রাপ্ত কার্নিটাইন নামক নিউট্রিয়েন্টটি পর্যায়ক্রমে হৃদরোগ সৃষ্টি করে। গবেষণাটিতে আরো দেখানো হয়, রেডমিট গ্রহণের পদ্ধতির ওপর মূলত করোনারি হার্ট ডিজিজ (সিএইচডি) এবং টাইপ-টু ডায়াবেটিসের ক্ষতিকারক অবস্থা নির্ভর করে। তাই রিপোর্টটিতে হৃৎপিন্ড ও বিপাকীয় সার্বিক সুস্থতার জন্য লাল গোশতের পরিমাণও কম গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। গোশতকে হৃৎপিন্ডের জন্য কিছুটা নিরাপদ করতে গোশত থেকে চর্বি বাদ দিতে নিচের বেশ কিছু কৌশল প্রয়োগ করলে ঝুঁকির পরিমাণ হ্রাস পাবে :

 

 

  •  কোরবানির গোশতের দৃশ্যমান চর্বিযুক্ত অংশ গোশত কাটার সময়ই বাদ দেয়া

 

  •  রান্নার আগে গোশত আগুনে ঝলসে বা সেদ্ধ করে কিছুটা চর্বি কমানো

 

  •  হলুদ-লবণ দিয়ে গোশত ছোট ছোট টুকরা করে সেদ্ধ করে ফ্রিজে রেখে জমে যাওয়া চর্বি বাদ দেয়া।

 

  •  ঝাঁজরা বা ছিদ্রযুক্ত পাত্রে গোশত রেখে অন্য একটি পাত্রের ওপর বসিয়ে চুলায় তাপ দিলে নিচের পাত্রটিতে গোশতের ঝরে যাওয়া চর্বি জমা হবে

 

  •  অনান্য উৎস্য থেকে চর্বি কমানোর জন্য রান্নায় ঘি, বাটারঅয়েল ব্যবহার না করে রাই ব্রানঅয়েল সম্ভব না হলেও সায়াবিন কিংবা লো-ফ্যাটযুক্ত পামঅয়েল ব্যবহার করা। এমনকি মিষ্টি তৈরির জন্য স্কিমড বা ননী তোলা দুধ ব্যবহার করা। একইভাবে ডিমের তৈরি যেকোনো খাবার থেকে কুসুম বাদ দেয়া যাতে পারে।

 

  •  উচ্চ আঁশযুতক্ত শাকসবজি, ফলমূল খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। বাড়তি ফলাফলের জন্য খাবারের সাথে সালাদ রাখা। সালাদ ও শাকসবজি খাবারের চর্বিকে শরীরে শোষিত হতে বাধা দেয়। শসা, টমেটো, লেবু সহযোগে এক বাটি সালাদ নিয়োমিত রাখা। খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানীদের তথ্য মতে, প্রতিদিন ১০ গ্রামের মতো দ্রবণীয় আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণে ৫-১০ শতাংশ কোটেস্টরল হ্রাস পায়।

 

  •  টকদই গোশতের কোলেস্টেরল যাতে শরীরে শোষিত হতে না পারে সে কাজটিও করে। তাই ঈদের যেকোনো খাবারের পর টক দুই রাখা যেতে পারে।

 

  •  বাড়তি কৌশল হিসেবে রান্নায় পর্যাপ্ত আদা ও রসুন এবং ভিনেগার ব্যবহার করা দরকার। কারণ আমাদের হৃৎপিন্ডের সুস্থতার জন্য আদা ও রসুন খুবই সহায়ক। দু’টি উপাদানই রক্তের বাড়তি চর্বি ও কোলেস্টেরল সরাসরি কমাতে সাহায্য করে। হাইপার কোলেস্টেরলযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে রসুনের আচার ও লেবু আলাদাভাবে খাবারের সাথে গ্রহণ করা যেতে পারে।

 

 

পরিসমাপ্তিতে বলা যায়, গোশত নির্বাচনের ক্ষেত্রে কৃশকায় গরুর গোশতই তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর। কারণ কৃশকায় দেশী গরুর গোশত কিংবা চর্বি বাদ দেয়া গরুর গোশতে অসম্পৃক্ত চর্বি খুবই কম থাকার জন্য ঝুঁকিও কম। অপর ্কটি গবেষণায় দেখা গেছে,কৃশকায় কম চর্বিযুক্তগরুর গোশতে বিদ্যমান কিছু এমিনো এসিড, টরাইন ও আর্জিনাইন রক্তের সিটোলিক প্রেসার কমাতে সাহায্য করে। এ ধরনের উৎস থেকে দৈনিক (৫০-১০০)গ্রাম গোশত গ্রহণে খুব একটা অসুবিধা নেই। তবে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে যাদের হৃদরোগ কিংবা ক্যান্সারের ঝুঁকি আছে, এরূপ ক্ষেত্রে রেডমিট এড়িয়ে চলা নিরাপদ।

 

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*