কোষ্ঠকাঠিন্য কেনো হয় ও রোধের উপায়

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  

আজ আমরা এমন একটি রোগ নিয়ে কথা বলবো যা আমাদের কাছে খুবই পরিচিত ও যে রোগটিতে ভোগেনি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। রোগটি হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। কোষ্ঠকাঠিন্য শরীরের একটি অস্বাভাবিক অবস্থা। যখন কোন ব্যক্তি সহজে মলত্যাগ করতে পারেন না। আবার দুই একদিন পর পর পরপর মলত্যাগের বেগ হওয়া এবং শুষ্ক ও কঠিন মল নিষ্কাশন কোষ্ঠকাঠিন্য বলে পরিচিত। এটি এমন একটি অবস্থা যখন খাদ্যনালী, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্রের স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যায়। ফলে পেট ফাঁপা বোধহয়, বমি বা বমির ভাব ও ব্যথা হয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণের মধ্যে খাদ্যভ্যাস পরিবর্তন, বেশি দুধজাতীয় খাবার গ্রহণ, কাজে ব্যস্ত না থাকা অর্থাৎ অলস জীবন যাপন করা পর্যাপ্ত পানি পান না করা, আঁশজাতীয় খাবার কম খাওয়া বা পরিপাকতন্ত্রের নার্ভ ও মাংপেশিতে সমস্যা হওয়া। এ জন্য বেশি আঁশযুক্ত সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, সালাদ, আশঁযুক্ত গমের আটা গ্রহণ কোষ্ঠকাঠিন্য হতে বাধা দেয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য এমন একটি সমস্যা যে সমস্যায় সকলের বয়সের অধিকাংশ মানুষই ভূগে থাকে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ, অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, ধূমপান, অনিদ্রা, কায়িক শ্রমের অভাব, হজমের সমস্যার কারনে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কোষ্ঠকাঠিন্য তেমন ভয়ানক সমস্যা নয় তবে বড় শারীরিক সমস্যা হতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কৃত্রিম ঔষধের থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রকৃতিক ব্যবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার চেষ্টা করা ভালো।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, হাইপোথাইরয়েডিজম, অন্ত্রের কোনো গুরুতর সমস্যা, যেমন: টিউমার, বিষণ্নতা ও মাদকসেবনের কারণেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়:

  • শাকসবজি: পাতাসমৃদ্ধ সবুজ শাকসবজি যেমন- পালংশাক এবং কুমড়ায় প্রচুর পুষ্টি ও আঁশ, ম্যাগনেশিয়াম কোলন সঙ্কোচন করে এবং পটাশিয়াম অন্ত্রের মাংস সঙ্কোচনে সাহায্য করে।
  • নিয়মিত আপেল খাওয়া:- প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে একটি খোসাসহ পুরো আপেল খাওয়া উচিত। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এক কাপ কুসুম গরম জল পান করতে হবে। এটা হজমে সহায়তা করবে এবং কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করবে।
  • এলাচ খাওয়া:- বড় একটি সাদা এলাচ এক কাপ গরম দুধে ভিজিয়ে রাখতে হবে সারা রাত। সকালবেলা এই এলাচটি থেঁতো করে দুধসহ খেয়ে ফল মিলবে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাটি যদি ভয়াবহ রকমের বেশি হয় তাহলে সকাল ও রাতে একইভাবে দুধসহ এলাচ খেয়ে ফল মিলবে হাতেগরম। এলাচ খাওয়া হল কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায় এর অন্যতম টোটকা।
  • মধু ও লেবুর রস:- এই নিয়মটি সহজ আবার একটু কষ্টসাধ্যও বটে! রাতের শোবার আগে এক গ্লাস গরম জলে এক চা চামচ মধু ও ১ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে পান করা যেতে পারে৷  ঘুমতে হবে বাঁ-কাত হয়ে৷সকালে ঘুম থেকে উঠে চিত হয়ে শুতে হবে৷
  • জাম:- বিভিন্ন ধরনের জাম যেমন দেশী জাম, মালবেরি, স্ট্রবেরি ইত্যাদিতে প্রচুর আঁশ আছে। আঁশের ফলে মলের পরিমাণ বাড়ায় সহজেই পরিপাকতন্ত্র দিয়ে নিচে নেমে যায়।
  • কমলা: কমলার মধ্যে মল নরমকারী ভিটামিন ‘সি‘ আছে। আঁশ আছে, যা মলের পরিমাণ বাড়ায় এবং ন্যানিজেনিন (ফ্লাভানয়েড) আছে, যা ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে।
  • আশযুক্ত খাবার গ্রহণ:- নিয়মিত আশযুক্ত খাবার বিশেষ করে শাক-সবজি খেতে হবে তাহলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায় এর দিকে তাড়াতাড়ি অগ্রসর হওয়া যাবে।

  • ইসবগুল বা ভূসি:- ইসবগুল বা ভূসি ১ গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে চিনি বা গুড়সহ নিয়মিত খালি পেটে সেবন করলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার পদ্ধতি গ্রামে-গঞ্জে দীর্ঘকাল যাবৎ চালু আাছে।
  • মিষ্টি বা পাকা বরই:- মিষ্টি পাকা বরই চটকে খোসা ও বীজ ফেলে অথবা ছেঁকে অল্প পানি মিশিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের উপশম হয়।
  • বেলের সরবত:- বেলের সরবতও উপকারী। ৩০-৩৫ গ্রাম পাকা বেলের শাঁস প্রতিবারে ১ গ্লাস পানিতে শরবত তৈরী করে দিনে ২ বার সেবন করতে হয়। এভাবে কমপক্ষে ৫-১০ দিন বেলের সরবাত পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।
  • বুচকি দানা:– বুচকি দানাও উপকারী। ২ গ্রাম পাতা চূর্ণ রাতে ঘুমানোর সময় গরম পানি অথবা দুধসহ সেবন করতে হবে। এটাও একটা কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায় এর পক্ষে খুবই উপযোগী।
  • বাদাম: বাদামে রয়েছে হৃদবান্ধব চর্বি, আমিষ ও আঁশ। এতে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম আছে, যা অন্ত্রের কাজে সহায়তা করে। পাকস্থলীর এসিড দূর করে মলকে অন্ত্রের মধ্যে নড়াচড়ায় সাহায্য করে।
  • কলা: পাকা কলায় প্রচুর আঁশ (পেকটিন) আছে, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রতিক্রিয়াকে স্বাভাাবিক করে। কলার আঁশ মল বাড়ায়। ফলে মল সহজেই বের হয়ে যায়। তবে কাচাঁ কলা বেশি কোষ্ঠকাঠিন্য করে।
  • গমের খোসা: গমের খোসা কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় করে এবং হজমের উন্নতি করে। গমের খোসায় অনেক আঁশ আছে।

সাধারণভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় না হলে ইসবগুলর ভুসি, ল্যাকটুলোজ সিরাপ, গ্লিসারিন সাপোপিটরি এবং এনিমা সিমপ্লেক্স বা ফ্লিট এনিমা দেয়া যেতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য দীর্ঘস্থায়ী হলে পায়ুপথে অর্শ, ফিশার এমনকি বৃহদান্ত্রে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। হবে যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান করলে এবং প্রতিদিন পরিমিত ঘুম হলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্যয় যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে:

  • ব্যাথানাশক ওষুধ: যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য রয়েছে তারা ব্যথানাশক ওষধ এড়িয়ে চলতে হবে।
  • প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া: প্রক্রিয়াজাত জাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
  • দুগ্ধজাত খাবার: দুধের তৈরি খাবার বিশেষ করে গরুর দুধ থেকে তৈরি ঘি, দধি এড়িয়ে যাওয়া ভালো। দুধে উচ্চ ল্যাকটোজ থাকে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি করে।
  • কফি পান করা: কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় কফি খাওয়া উচিত নয়। ক্যাফেইন অন্ত্রের জন্য ক্ষতিকারক।
  • অন্যান্য: এছাড়া লাল মাংস,  চিপস, ভাজাপোড়া খাবার, কফি, চকলেট, কেক, পেস্ট্রি ইত্যাদি এড়িয়ে চলা ভালো। যেসব খাবার তৈরিতে প্রচুর চিনি ব্যবহৃত হয়, সেসব খাবারেও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। কাঁচকলায়ও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।  তবে বেশি সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ মতো চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন।

মেডিকেলবিডি/আরএম/ ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

20 + 13 =