বিবর্তনবাদ, ডারউইনিজম এবং ইসলাম

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  

বিবর্তনবাদ, ডারউইনিজম এবং ইসলাম

টপিকটি একটু রিস্কি। একটু এদিক হলে মোল্লারা ধেঁয়ে আসবে, আবার একটু ওদিক হলে তথাকথিত শিক্ষিতসমাজ নাক সিঁটকাবে। তাই আজ আমি মোটামুটি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে উপর্যুক্ত বিষয়ে আলোচনা করতে চাই।

এখনও মনে পড়ে আমার যখন ইন্টারে বোটানি পড়াচ্ছিলেন, মাস্টার মশাই সুন্দর করে বলে দেন, বিবর্তনবাদ শব্দের শেষে বাদ আছে তাই ঐ থিওরিটাও বাদ। শুধু পড়ার জন্যে পড়তে হবে। বিশ্বাস করার দরকার নেই। কিন্তু এখন এতদূর এসে জানি বিবর্তনবাদ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। বিবর্তনবাদের পক্ষে বিপক্ষে অসংখ্য থিওরি আছে।

এখন মূল সমস্যাটি হল, দুই দলই বলতে গেলে তাদের মতের ব্যাপারে একদম কট্টর। একদল মনে করেন ডারউইন একদম শ্বাশ্বত সত্য, অন্যদল মনে করে সর্বৈব মিথ্যা। এ সমস্যা নিয়ে ভাবতে ভাবতে, বেশ কিছুদিন পড়াশোনাও করলাম। এ লেখাটি আমার পাঠের সারাংশই।

শুরুতে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেই, বিবর্তনবাদ এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদ একই বিষয় না। ডারউইনের বিবর্তনবাদী যারা আছেন তারা এই মৌলিক পার্থক্য ধরতে পারেন না হয়ত, ধরতে পারলেও এড়িয়ে যেতে চান জেনেশুনে। সেজন্যেই তারা তাদের মতবাদের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সাধারণ বিবর্তনকে টেনে নিয়ে আসে। এখন মূল বিতর্ক কিন্তু বিবর্তন নিয়ে না, বিবর্তন একটা অবজারভেশন, যা বিশ্বাস অবিশ্বাসের কিছুই নেই, জগতে সবকিছই বিবর্তিত হয়, যা ইসলামও সমর্থন করে। মূল বিতর্কের জায়গা হল ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশন এবং স্পিসিস ট্রি অর্থাৎ মোটামুটি একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবগুলো একই পূর্ব পুরুষের বংশধর এই দুটি ব্যাপারে।

ডারউইনের সেইম লিনিয়েজের ব্যাপারটা লেমার্ক নাকোচ করে দেন, তিনি তার জায়গায় মাল্টিপল লিনিয়েজের মতবাদ ব্যক্ত করেন। ডারউইন মূলত তার কিছু অবজারভেশনের প্রেপ্রেক্ষিতে কিছু অ্যাজাম্পশন দিয়েছিলেন, যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে ডারউইনের মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু বিজ্ঞানে একেবারে শতভাগ সত্য কোনও থিউরি নেই। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে একদম। নিউটনের থিউরি প্রায় দুশ বছর ধরে সবাই সর্বৈব সত্য ধরে নিয়েছিল। তার থিউরি দিয়ে অনেক বিষয় ব্যাখ্যা করাও গিয়েছিল। রকেটও আবিষ্কৃত হয়েছিল তার থিউরি থেকে। যে মুহূর্তে আইনস্টাইন সাহেব আবির্ভূত হলেন, সবার ধারণা ৰুল প্রমাণ করে আইনস্টাইন দেখিয়ে দেন, নিউটনের থিউরি ভুল ছিল। তারপর থেকে শুরু হল আইনস্টাইনের ফিজিক্সের যুগ। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আইনস্টাইন সাহেবের থিউরিও নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে দেখানো যাবে বিজ্ঞান একটি চলমান প্রক্রিয়া। আজকে আমরা যা সত্য বলে জানছি কাল তা ভুল প্রমাণিত হবে না, তার কোনও গ্যারান্টি নেই।

তো ডারউইন সাহেবও যে একেবারে সত্য ছিলেন, তা বলা যায় না। এখন পর্যন্ত যত থিউরি আসছে তা অনেকাংশে হয়ত ডারউইন কে সমর্থন করে, কিন্তু কাল হয়ত এমন কোনও থিউরি আসতে পারে যা তাকে ভুল প্রমাণিত করবে।

এবার বানরের গল্পে আসা যাক। মানুষের মধ্যে একটি খুব কমন ভুল ধারণা, ডারউইন বলেছেন, বানরের থেকে মানুষের উৎপত্তি। বস্তুত ডারউইন এমন কিছু বলেনি। এটি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া একটি গুজব। কিন্তু ডারউইন বলেছেন, মানুষ এবং তার কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের যে স্পিসিস সমূহ আছে, তাদের পূর্বপুরুষ একই। এটিও তার একটি এজাম্পশন। ব্ল্যাক সোয়ান থিউরি দিয়ে তা বর্ণনা করা যায়। ব্যাপারটি বেশ চমকপ্রদ। ধরুন আপনি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে গেলেন যেখানে শুধু সাদা হাস পাওয়া যায়, তা থেকে আপনি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে গেলেন যে, জগতের সব হাস সাদা। কিন্তু যে মুহূর্তে কালো হাস আপনার সামনে চলে আসে আপনার পূ্র্বতন থিউরি আর টিকে না।

ডারউইনের সেম্পল সাইজ ছিল একেবারেই ছোট। জেনে অবাক হবেন যে, বিজ্ঞানীরা এখনও পর্যন্ত এক শতাংশ প্রজাতির খোঁজও পাননি। সেখানে আপনি যদি চার বিলিয়ন বছরের প্রজাতি নিয়ে অ্যাজাম্পশন দিতে যান, কিংবা একটি থিউরি দাঁড় করাতে চান ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আমরা হয়ত যত বেশি প্রজাতির সম্পর্কে জানতে পারব, বিষয়গুলো আরও বেশি পরিষ্কার হবে। এ বিষয়টি স্ক্যাটার্ড গ্রাফ ফেনোমেনন দিয়েও বিশ্লেষণ করা যায়।

তার মানে পুরোপুরি বিষয়টি দাঁড়ালো, বিবর্তন একটি অবজারভেশন। যা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। ইসলামে তা নিয়ে কোনও ঝামেলাও নেই। যেমন মানুষ লম্বা থেকে খাটো হচ্ছে, ফসলের আকারের পরিবর্তন ইত্যাদি ইত্যাদি। টাইম ফ্রেম নিয়ে যে সমস্যা আছে ইসলামে তাও সুন্দর করে ব্যাখ্যা করা যায়। ডারউইনের অনুসারে, প্রজাতির বিবর্তনের মাধ্যমে নকুন প্রজাতির উদ্ভব হতে অনেক লম্বা সময় লাগে। দেখতে বিষয়টি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও, বিষয়টি কিন্তু তেমন না। কোরান হাদিসের নানান বর্ণনায় পাওয়া যায়, আখিরাতের একদিন দুনিয়ার হাজার বছরের সমান। তাই সময়ের ব্যাপারে ইসলামে কোনও সমস্যাই নেই। বিবর্তন এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদ একই বিষয় নয়। যদিও তা অনেক বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে পারে, তা শ্বাশ্বত ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ বিজ্ঞান একটি চলমান প্রক্রিয়া। অতীতের ইতিহাস তাই বলে।

ইসলামে মানবজাতির সৃষ্টির ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান। কোনও মুসলমানের পক্ষে তা অবিশ্বাসের অবকাশ নেই। যেমন আদমের সৃষ্টি। ডারউইনের থিউরি তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। হয়ত সামনে আরও এমন কিছু থিউরি আসবে যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ ব্যাপারে আল্লাহ সর্বজ্ঞ। বিবর্তনবাদ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, তাই আমাদের উচিত এ নিয়ে আরও ‌অনেক বেশি গবেষণা করা। ডাঃ মোঃ রহমতউল্যাহ  (শুভ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

8 + 1 =